খাচ্ছিও না,গিলছিও না(বাংলা - মিডিয়াম - স্কুল)
চিন - ভারতের যুদ্ধ কত সালে হলো? মনে নেই? আচ্ছা তুর্কি আক্রমণে বাঙলার কী পরিবর্তন হলো?কী হবে জেনে? বেশ। গান্ধীজি কি ভেবেছিলেন নতুন ভারতবর্ষ নিয়ে? জানার কি দরকার?তাও হলো। সিঙ্গুর- নন্দীগ্রামে মাওবাদী যোগাযোগ ছিল? এটা জানেন।মাওবাদটা কী বস্তু স্যার? থতমত। এরাই ইতিহাস পড়াচ্ছেন বাঙলার স্কুলগুলোয়।আপনি হয়তো ভুল করে বলে ফেললেন প্রতীচী -ট্রাস্টের কথা।বলে ফেললেন যে তারা বলছে মানে তাদের সমীক্ষা বলছে বাংলার শিক্ষাজগতে শিক্ষকদের কাজকর্ম মোটেই আশানুরূপ না।তারা শুনেই একবাক্যে বলবে এই পোতিচি টাস্টটা আবার কী? আপনি হয়তো এবার খানিক ব্যোমকে গিয়ে বললেন অমর্ত্য সেন...। এবার এলো তাচ্ছিল্য। 'ওসব অমত্ত সেন - ফেন বলে কী হবে! উনি কী এমন করেছেন?' আপনার রাগ হচ্ছে? রাগ করবেন না। এটাই আম-বাংলার তথাকথিত শিক্ষকদের একটা বড় অংশের হাল।তথাকথিত বললাম কারণ এরা শিক্ষক অভিধার যোগ্য বলে আমি অন্তত মনে করি না।আর বাংলার শহর- মফস্বল না হোক গ্রামগুলো অন্তত জানে যে এরা শিক্ষক মোটেই না,বড়জোর মাস্টার বলা যায় এদের।কি হাল এই মাস্টারদের? এরা সর্বজ্ঞানী মনে করেন নিজেদের। ফলতঃ কিছুই জানেন না।না জানায় সমস্যা নেই।সমস্যা হলো এরা জানার চেষ্টাও করেন না। এই ধরুন সিলেবাস পাল্টেছে তা নয় নয় করে ৫/৬ বছর হতে চললো,এখন বাংলা ভাষা - সাহিত্যের মাস্টারদের জিগেস করুন ক্লাস ৫-এ তিনটে লিমেরিক পড়াতে হয় আপনাদের, লিমেরিক ব্যাপারটা কী বলুন তো?হলফ করে বলছি এখন এই সিলেবাস চালু হবার ৫ বছরের বেশি সময় পরেও ৯০% বাংলার মাস্টার গাল হাঁ করে থতমত হয়ে থাকবে।বাকি ১০% এর অর্দ্ধেক সেটুকুই বলবে যেটুকু টেক্সট বইতে লেখা আছে।আপনারা ভাবছেন কেন এমন হবে? এই শিক্ষকদের তো প্রতি বছর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ!! সে আর এক মজা!! সে যে দেয় আর যে নেয়, তারা ছাড়া এ মজার ভাগ পাওয়া যায় না।যে ট্রেনিং দেয় সে নিজেই কিচ্ছু বোঝে নি।সেটা বিনা দ্বিধায় সে আগেই ঘোষণা করে দেয় আজকাল।না করে তার উপায় কী? তার কথা শুনবেটাই বা কে? সকলেই জানে সে এসেছে শাসক দলের শিক্ষক - সংগঠনের সুপারিশে।এদের বেশিরভাগেরই ভাঁড়ে মা ভবানি।যারা একটু জানে-টানে তারা পুরুষ হলে শিক্ষিকাদের কয়েকজন একটু বুঝে-সুঝে নিতে চায়।নারী হলে শিক্ষক মহলে মৃদু কলকাকলি। কিন্তু যেটা তারা বলছে সেটা শোনার দরকার নেই।কারণ এরা তো সকলেই সর্বজ্ঞ।নতুন কিছু জানা বা বোঝার এদের দরকার নেই। এর মধ্যেই আজ কাগজে পড়লাম, মাস্টাররা নাকি এবার থেকে পাঠের সঙ্গে সঙ্গে নীতিবোধ শিক্ষা দেবেন।এই একটা ব্যাপার নিশ্চয়ই মাস্টারদের দারুণ পছন্দের হবে বলেই ভাবছেন? কেন ভাবছেন? কারণ আপনি তো ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছেন মাস্টার মানেই নীতির সুটকেশ।খেটো ধুতি আর ফতুয়া পরে সামান্য শাকান্ন খেয়ে আপনাদের ছোটবেলার মাস্টাররা পাঠশালায় এসেই নীতির দেরাজ খুলে বসতো না? পড়াতো তো --- 'সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি'... তাই না? এখন এই ভালো ব্যাপারটা কী? সে ওই ছড়াতেই দেগে দেওয়া হয়েছে। 'আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে---'। এখন গুরুজন কে? বাবা, মা, কাকা, চাচা, নানা,নানী। তারা যা বলবে তাই করতে হবে।তারা কী করে? কেউ আপিসে গিয়ে খানিক জিরিয়ে মুরুব্বিদের পা টিপে,কি একটু স্তনবৃন্তের ছোঁয়া দিয়ে প্রমোশন নিশ্চিত করে এসেই মক্কেলদের সামনে বাঁ- হাত বাড়ায়।তারা কচিদের আদেশই বা কী করবে! তাহলে সদুপদেশ কারা দেবে? মাস্টাররা। জীবনের নীতি তাদের কাছে কী? ধম্মে যা সইবে+সমাজে যা প্রচলিত+যা করলে পয়সা করতে পারবে দেদার সেইসব কাজ চালিয়ে যাও। পেন্নাম করলেই মাস্টাররা বলে মানুষ হও।মানুষ হওয়ার মানে হলো কি করলে নিজের ভালো হয় বুঝে এগোও। এই হলো আমাদের অনাদি-অনন্ত নীতিবোধ।অভীক মজুমদারের সিলেবাস কমিটি সাহিত্য পড়ানোর ক্ষেত্রে এই পেঁকো নীতিবোধ চটকে দিতে চেয়েছেন।ঠিক করেছেন। এখন ডাকাতের মা গল্পটা থেকে শুরু করে সিক রোস এইসমস্ত ক্ষেত্রেই প্রাচীন / সমসময়ে অপ্রাসঙ্গিক নীতিতে আটকে না রেখে ছাত্রী-ছাত্রদের মুক্ত-ভাবনাকে উস্কে দেওয়ার দিকে সিলেবাসে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।কিন্তু সেই ভাবনা মাস্টারদের মানসিকতা পাল্টাতে পেরেছে কী? অধিকাংশ মাস্টাররা তাঁর নিজের বিষয়টাতেই সময়ানুগ নন।এই সময়ের বাংলা সাহিত্য- সংস্কৃতির পাঠ দিতে যাওয়া ক'জন মাস্টার বাংলা গানের ইতহাসে সুমনের প্রাসঙ্গিকতা সম্বন্ধে স্বচ্ছভাবে বুঝতে পেরেছেন? সে না হয় বাদ দেওয়া হলো,ক'জনই বা জানেন কমলকুমার বা অমিয়ভূষণ কিম্বা মনীন্দ্র গুপ্তের লেখার খবর? আরো একটা ব্যাপার দেখে বেশ হাসি পেলো।আজ অর্থাৎ ২৬শে মার্চের আনন্দবাজারের খবরে দেখলাম স্কুলবালিকা-বালকদের নীতিশিক্ষা দেওয়ার জন্য নাকি লেখকদের জীবনী পড়ানোও হবে ছাত্রী - ছাত্রদের। লেখকদের জীবনীতে নীতিশিক্ষা!!কার জীবনী পড়ানো হবে? রবীন্দ্রনাথ?আচ্ছা,আন্না তড়খড়ের সময়গুলো ছুঁয়ে যাবেন? তারপর কাকে পড়ানো হবে নজরুল? এটা কি বলা হবে কবি চৈতালি চট্টোপাধ্যায়-এর মাকে বাড়ি থেকে কাজি সাহেবের কাছে গান শিখতে পাঠানো হয় নি নজরুলের চরিত্র-দোষ ছিল বলে? তারপর? আচ্ছা সমরেশ বসু,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়? পড়ানো হবে এদের জীবনী? র্যাঁবো,নেরুদা?পড়ানো হবে এদের নীতিবোধ? এসব দেখে শুনে শুধু এটাই বলতে ইচ্ছে করে --- ' হে শিক্ষা,ভাণ্ডারে তব বিবিধ ঘোঁতন....'। বদ্ধপাঁকে ঘোঁত - ঘোঁত করা ছাড়া এদের আর উপায় কী!!
Comments
Post a Comment