আব্বা লিখবে না!!বাবা লিখবে!!
আব্বা লিখবে না!! বাবা লিখবে!!
এক বন্ধু আমায় একটা মেসেজ পাঠিয়েছে।আমার বন্ধু স্বাতী। বাংলা প্রকাশনার জগতে তার একটা খ্যাতি আছে। সে লিখেছে যে তার মেয়ে রোশনাই, বাবাকে 'বাবা' না বলে ছোট থেকেই আব্বা বলে ডাকে। সেই ছোট্ট মেয়ে রোশনাই-এর স্কুলে একটা অনুচ্ছেদ লিখতে দিয়েছিল, 'তোমার পরিবার'। সেই অনুচ্ছেদে সে বাবাকে 'আব্বা' বলেই লিখেছে।এই পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল,এখন সমস্যাটা হলো যে,তার স্কুলের শিক্ষিত(?) শিক্ষক তাকে 'আব্বা' লিখতে বারণ করেছে। কারণ হিসেবে জানিয়েছে যে বাবাকে 'আব্বা' বলে মুসলমানরা, তাই এরকমটা লেখা যাবে না।এটা ঘটেছে কোথায়? না,যাদবপুর বিদ্যাপীঠ স্কুলে।মানে কলকাতা শহরের বেশ নামকরা একটা স্কুলে।
দ্বিতীয় ঘটনাটা ঘটেছে একটু গ্রামের একটা স্কুলে। আমার তরুণ কবিবন্ধু জিয়া হক একটা স্কুলে বি,এড -এর প্র্যাকটিস টিচিং করতে গেছে। সে যখন স্টাফরুমে বসেছিল তখন এক 'জাতীয় শিক্ষক' সম্মানে ভূষিত শিক্ষক স্টাফরুমে বসেই বলেছেন,তিনটে 'ম' থেকে আমাদের সাবধান থাকা উচিত। মদ,মহিলা,মুসলমান।
এই দুটো ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষালয়গুলোতে শিক্ষকদের শিক্ষা আর মানসিকতার বহর স্পষ্ট। এখন কথা হলো একজন মানুষ কী শেখে? সে জগত আর জীবনকে নিজের চোখে দেখতে শেখে।সেটা যিনি শেখান তিনি হলেন শিক্ষক।আমি এইসব নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম কেন? কারণ পড়ানো ব্যাপারটা আমি উপভোগ করতাম। পড়ানো মানেই যে শিক্ষকতা তা কিন্তু না।পড়ানো একধরণের মাস্টারি।শিক্ষকতা ব্যাপারটা অনেক বড়ো। শিক্ষকরা একটা জাতির জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিতে পারেন,শুধু ছাত্রের মনের ম্যাপটা একটু পালটে দিয়ে।পাল্টাতে গেলে খুব যে মহাযজ্ঞ করতে হয় তা না।শুধু ছাত্রের ভিতরে আপনি জ্বলতে থাকা আগুনটাকে একটু উস্কে দিতে হয় আর অন্যের চোখে জগত - দেখার অভ্যেসটাকে একটু পালটে দিয়ে ছাত্রের নিজের চোখটা খুলে দিতে হয় আর তার মনের মধ্যে এই বিশ্বাসটা ঢুকিয়ে দিতে হয় যে সে পারবে। এইটুকু কাজ করতে গেলে তার যেটা প্রথম দরকার সেটা হলো সংস্কারহীন মন নিয়ে জগৎকে নিজের মতো করে দেখার ক্ষমতা।এখন প্রশ্ন হলো নারী-পুরুষ-ভেদে আমাদের এই বাংলার শিক্ষকরা বেশিরভাগ দুটো জিনিস অর্জন করতে পারে না।তারা মান্ধাতার আমলের চিন্তা-ভাবনাকে ছাড়তে রাজি না।কেউ ঠেলা মারলেও না। তাদের মনোজগৎ শালগ্রাম শিলার মতো জবুথবু। তাই দেখবেন এর প্রভাব আমাদের জাতীয় চরিত্রে জাঁকিয়ে বসে আছে। এই ধরুন আমার বাবা হয়তো সলিল চৌধুরী শুনে আপ্লুত। অতএব আমিও আপ্লুত। সুমন আমি শুনবো না।শুনলেও প্রি-কনসিভড আইডিয়া থেকে আমি ধরেই নেবো যে পুরোনো দিনের গানই শ্রেষ্ঠ। নতুনকে গ্রহণ করতে করতে আরো এক প্রজন্ম চলে যাবে। উত্তম-সৌমিত্র-এ সিনেমা আটকে যাবে। এইসব সাংস্কৃতিক সংস্কার আমাদের কৃষ্টিকে থমকে দেবে।কেউ বোঝালেও আমরা বুঝবো না।কারণ নতুনকে গ্রহণ করার চোখ,কান,নাক,জিভ,ত্বক মায় উপস্থও তৈরি নয় আমাদের। আমাদের দোষ। তার থেকেও বেশি দোষ এভাবে যারা আমাদের ভাবতে শিখিয়েছে সেই শিক্ষকদের। শিক্ষক মানে তো কেবল স্কুল শিক্ষক না। পরিবার,সমাজ,রাষ্ট্র সকলেই আমাদের শিক্ষক। কিন্তু সকল শিক্ষকের থেকে বেশি দায় স্কুল শিক্ষকদের।যখন আমাদের বুদ্ধি - বিবেচনা আর ওই জীবনকে দেখার চোখ তৈরি হচ্ছে তখন তাকে পথ দেখানোর দায়িত্ব ছিলো তাদের ওপর।এই শিক্ষকেরা অনেকে জানেই না তাদের দায়িত্ব। জানে না,কারণ তাদের শিক্ষকরা তাদের এটা শেখায় নি।তাই আমাদের কৃষ্টি খুব ধীরে গড়াতে গড়াতে এগোয়।যে সময় মুক্ত-বাজার অর্থনীতির ফল ভোগ করছে, যে সময়ে আন্তর্জাল মানুষের যাপনকে নিয়ন্ত্রণ করছে,সেই সময়ে দাঁড়িয়ে যদি পুরোনো নীতি আর মূল্যবোধ দিয়ে তারা শিক্ষা দিতে চায় তবে সর্বনাশের একশেষ।আবার তার সঙ্গে যদি ধর্মান্ধতা যুক্ত হয় তবে তাদেরই পোয়াবারো যারা মানুষকে পশুর মতো ব্যবহার করে আখের গোছায়।এই লেখাতে আমি দুটি ঘটনা উল্লেখ করলাম, এই দুটোই প্রমাণ করে যে শিক্ষকরা অনেকেই এখনো মানুষকে ধর্ম দিয়ে মাপেন।আজকের প্রযুক্তির এই বিপুল উন্নতির যুগেও ধর্মীয় উন্মাদনা মানুষকে যে খুনি করে তুলতে পারে তার মূলে রয়েছে অপশিক্ষা, সে শিক্ষা আমাদের বিদ্বেষ শিখিয়েছে,অথচ তার কথা ছিল ভালোবাসতে শেখানো।আরো একটা সমস্যা হলো শিক্ষকদের মন এখনো মুক্ত না।তাই,ছাত্র (নারী/পুরুষ) যখন বাবাকে পাপা,ড্যাডি বলে তখন তারা দিব্বি আনন্দিত, কিন্তু 'আব্বা' তে সমস্যা।এখানেই একটি বিশেষ ধর্মকে ঘৃণা করা/নীচু করার বীজ উপ্ত হয়।
সরকার কয়েকদিন আগে শিক্ষকদের জন্য আচরণ - বিধি ঘোষণা করেছে।সেখানে বলা হয়েছে স্কুলে শিক্ষকরা কোনো সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করতে পারবেন না।ভালো ব্যাপার। কিন্তু মন্তব্য হয়তো করলেন না,মন থেকে কি ঝাড়বেন।ঝাড়বেন না।কারণ কোথাও তিনি হয়তো জেনেছেন কোনো মুসলমান, হিন্দুর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে।এবার অন্য লোকে তাঁকে শিখিয়েছে এটা ভয়ংকর। প্রতিবাদ করতে হবে।ঘৃণা করতে হবে।তিনি শিখেছেন।তাঁর মনকে সামান্যতম কাজ করান নি।ভাবেন নি এই বিদ্বেষের ফল কি হবে। আর একটা বিপদ হলো 'পিতা ধর্ম,পিতা স্বর্গে'র শিক্ষা। একবার যদি এই উপদেশ ভিতরে ঢুকে পড়ে তো ব্যাস! সাড়ে পনেরো আনাই কেঁচে গেলো।যার পিতা মূর্খসে সেই পিতাকে স্বর্গ মনে করতে শুরু করলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। মানুষজাতির পিতা হনুমান।অতএব মানুষ হনুমানকে স্বর্গজ্ঞান করে বসেছে। এখন যে মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখে নি,অন্যকে প্রশ্ন করতে শেখে নি,যে কেবল ভিজে বেড়ালের মতো জগত - সংসারকে প্রশ্নহীন আনুগত্যে মেনে নিতে শিখেছে সে কিকরে নতুনের পথে চলবে? চলতে পারতো যদি তার শিক্ষকেরা শিক্ষিত হতো।কিন্তু যে শিক্ষা মনকে পরিশীলিত করে সেই শিক্ষার পথ আমরা ভারতীয়রা বহুকাল ভুলেছি। কারণ স্থির করতে পারি নি আমাদের বাবা কে? পিতা বলে যদি প্রাচীন মুনিদের মেনে নিতাম,তবে তাদের স্বর্গ/ধর্মজ্ঞান করলেও একটু মনন-সমৃদ্ধির প্রত্যাশা করা যেতো। কিন্তু তার মাঝখানে ইংরেজ বাবা ঢুকে পড়ে ব্যাপারটা পুরো গুলিয়ে দিয়েছে।আমাদের কৃষ্টি থেকে গেছে প্রাচীন যুগে অথচ শিক্ষার উদ্দেশ্য আংরেজি বাবুদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ইংরেজ এদেশে শিক্ষা-ব্যবস্থা সাজিয়ে তুলেছিল প্রধানত শাসন- উপযোগী কেরানিকূল গড়ে তোলার জন্যে।তাদের ব্যবস্থা মেনে নিয়ে আমরা কেবল চাকরির জন্যে পড়াশোনা করতে শিখেছি।সেই শিক্ষার বিষগাছে অমৃত ফল ফলার কথা ছিল না।ফলেও নি। কেজো শিক্ষার পিছনে ছুটে আমরা মনন আর মনুষ্যত্ব দুটোই হারাতে বসেছি।এই অবস্থায় গতিশীল হয়ে ওঠার প্রশ্নই ছিল না।তাই অবস্থা ভয়াবহ। ক্রমাগত আমরা লতা মঙ্গেশকর শুনে চলেছি, কোনোদিন ভাবতে চাই নি,তার গানের সৃজন কে করলেন? বাইরের চাকচিক্যকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে সৃজনশীলতাকে বধ করে বসে আছি।
তবে উপায় কি আর একদম নেই? আছে।এখনও সময় আছে।শিক্ষকদের শিক্ষিত করে তোলার নিরন্তর চেষ্টা করলে, পুরোনোর দাসত্ব থেকে বেরিয়ে এসে নতুনের দিকে চলার মন্ত্র তাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারলে হয়তো কিছু ছবি কিছুটা হলেও পালটে যেতে পারে।
চিন্তা উদ্রেককারী
ReplyDelete