প্রতিবাদ করো তিতুমীর,তিতুমীর

                     প্রতিবাদের ভাষা
                                     প্রসূন মজুমদার

তুমি যত অস্ত্র নেবে হাতে
আমি তত অস্ত্রহীন হব
তুমি যত করবে অপমান
আমি তত সহ্য করে যাব
তুমি যত হবে লাস্যময়ী
আমি তত হব সাদাসিধা
তুমি যত বলবে 'প্রতিশোধ '
আমি তত বলব, 'ক্ষমা করো'
তা বলে ভেবো না পাচ্ছি  ভয়
ভেবো না এ যুদ্ধে হেরে যাব
প্রতিদিন লিখব কবিতা
গাছে গাছে কবিতা টাঙাব...'

গতকাল  সরকার আয়োজিত লিটিল ম্যাগাজিন মেলা থেকে কবি অংশুমান করের 'মুখপুস্তিকা-লিপি' বইখানা কিনে ফেলেছি।
মাননীয় পাঠক, আপনি কিন্তু ভাববেন না উপরের বাক্যটা কেবল একটা এলেবেলে ইনফরমেশন দেওয়ার জন্যে লিখে ফেলা।এখানে 'সরকার আয়োজিত ' শব্দবন্ধটা ব্যবহার করলাম সেটা অত্যন্ত ভেবেচিন্তে আর খুব দরকারি একটা সিগনিফায়ার হিসেবে লিখেছি।কারণ যে কবিতাটার কথা লিখছি সেটা মুখপুস্তিকা-লিপি বই-এর শেষ লেখা এবং লেখাটির শীর্ষনাম 'আমার প্রতিবাদের ভাষা'। বলা বাহুল্য যে লেখাটা আমার মনে ধরেছে।কারণ এখানে প্রতিবাদের ধরণ-ধারণ বেশ স্পষ্ট করে ফুটে আছে।এখন কথা হচ্ছে লেখাটা পাওয়া যাচ্ছে সরকারের লিটিল ম্যাগাজিন মেলায়।এতে আমার কোন রাগ হয় নি।কিন্তু কিছু প্রতিবাদীর রাগ হতেই পারে।একজন প্রতিবাদী এই প্রসঙ্গে স্বীয় মুখপুস্তিকায় সরকারি মেলা আর পুরস্কারগুলোকে বয়কট করার ডাক দিয়েছেন।তাঁর প্রতিবাদের ভাষার প্রতিবাদে আর এক প্রতিবাদী পুরস্কার বর্জনের এই প্রতিবাদী স্বরের উল্টপিঠেই যে পুরস্কার পাওয়ার নীরব লোভ ঘাপটি মেরে আছে সেটা মনে করিয়ে দিয়েছেন।হ্যাঁ,মনে করিয়ে দিয়েছেনই লিখলাম, কারণ ফ্রয়েড থেকে লাকাঁ,ইউং থেকে ম্যাকডুগাল সমস্ত মনস্তত্ববিদ এবং মনোদার্শনিক সোজা বা বাঁকাভাবে এই কথাই বলেছেন।এখন আমার চর্চার বিষয় এটা নয় যে কে প্রতিবাদ করলো বা কি প্রতিবাদ করল বা প্রতিবাদীর বক্তব্য ঠিক না ভুল এইসব হাবিজাবি।আমার কথা বরং এটা নিয়ে ভাবিত যে প্রতিবাদ আর তার প্রতিফল। প্রতিবাদ ব্যাপারটা খুব জরুরি এটা বলে আর কিচ্ছু নতুন কথা পাড়ার অবকাশ নেই।ব্যাপারটা হল প্রতিবাদ একটা অটোমেটিক প্রতিক্রিয়া মাত্র।মানে বদ ধাতু থেকে আসা যে ক্রিয়া সে হলো বাদ।ভাষা। এই ভাষাই আসলে আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।আমাদের আমি আসলে ভাষার প্রতিবিম্ব।  ভাষা ব্যবহার করেই আমাদের বলা,মানে বাদ।এক বাদকে আমরা কখনো প্রকাশ করি,কখনো গিলে ফেলি।কারণ বাদ যখন বলা হয় তখন একটা ক্রিয়া সম্পাদন করা হয়,আর ক্রিয়া থাকলে তার প্রতিক্রিয়া থাকতে বাধ্য।বলার সময় নিশ্চয়ই  আমরা ভিতরে এটাও ভাবতে থাকি যে   কথার কন্সিকুয়েন্সটা কি হবে।এবং আত্ম-সেন্সরশিপের চাহিদায় খানিকটা কেটে - ছেঁটে বলি।কেউ কেউ এই কাঁচিবাজির পরোয়া করে না।বুকের ভেতর যে বৃষ্টি পড়ে তারই বাষ্প বাতাসে ভাসায়।এদের বাদের প্রতিবাদ হয়,হবে,হতে থাকবে।কিন্তু তাদের বলার মধ্যে একধরণের সততা কাজ করে।এক্ষেত্রে প্রতিবাদ বা বিরূপতা আসবে জানলেও কেবল ভাবনাকে লুকিয়ে রাখতে না পেরে বক্তা মন্তব্য করে একধরণের রিলিফ পান।যেমন ধরুন শক্তি একবার বলে ফেলেছিলেন 'এতো কবি কেন?' বা এই সেদিন মৃদুল দাশগুপ্ত বলে ফেললেন,' মেয়েরা কবিতা লিখতে পারে না।' আমার খুব মনে হয় এই সমস্ত বলার সময় বক্তা মনে রাখেন না যে কী ভয়ংকর প্রতিবাদ হতে পারে।প্রতিবাদ শুরু হওয়ার পর তাই এইসব হুট করে বলে ফেলা কথার থুতু গিলতে তাবড় তাবড় মানুষকেই ঢং করে ঢোঁক গিলতেও দেখা যায়।
সুতরাং এই আলটপকা করে ফেলা মন্তব্যগুলো মোটেই এই লেখার গন্তব্য নয়।এই লেখার কলম খুঁজছে তাদের যারা অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা প্রতিবাদ পেশ করেন।এই যেমন ধরুন না কেন বব ডিলান।সারা জীবন প্রতিবাদ করে শেষমেশ নোবেল পাওয়ার পর ভড়কে গিয়ে বেশ কিছুদিন ভেবেচিন্তে তবে প্রাইজ নিতে স্বীকার করলেন।তো, কি বলি ডিলানের মতো মহাপুরুষ যদি এইসব করেন তবে আমাদের সুমনের মতো মহা বাঙালি কেনই বা পারবেন না? তিনি তাই সময় - সুযোগ মতো বাদেও আছেন, প্রতিবাদেও।যেখানে খুশি যখন খুশি তিনি থাকতে পারেন।এই অবস্থানের চুলচেরা কাটাছেঁড়া করতেও এই লেখা নয়। এই লেখাটা শুরু করলাম এক ধরণে প্রতিবাদের ইনফাইনাইট লুপের ঘুরপাক মুখপুস্তিকায় মানে ফেসবুকে ঘনিয়ে উঠতে দেখে।মানে ব্যাপারটা হল কি যে,কোনো এক অজানা তাগিদে সরকারি লিটিল ম্যাগাজিন মেলা এবার স্থানাঙ্ক প্রায় ১৮০  ডিগ্রি ঘুরিয়ে নিয়ে রবীন্দ্র পাছা থেকে ওকাকুরার মুখে গিয়ে পড়েছে। এই সুবাদে নিজ নিজ ভাবমূর্তি নিজ নিজ ভক্তকুলে চালান করার অভিপ্রায়ে বিবিধ বাদ আর তার স্বাভাবিক প্রতিবাদ সামনে এসে পড়েছে।বাংলা সংস্কৃতির একদল নতুন-পুরোনো লড়াকু লোকজন প্রথমে স্থান-পরিবর্তনের জন্যে নিয়মানুগ  প্রতিবাদ পেশ করেও কোনোরকম সদুত্তর না পেয়ে  শেষে নিজেদের চেষ্টায় একটা জায়গা খুঁজে নিজেদের উদ্যোগেই একটা ভিন্ন মেলা আয়োজন করেছে।এই বিষয়ে তারা শাসক সরকারের বিরুদ্ধে কোনো রূঢ় কথা বলে নি।কিন্তু বলে বসলো,হিসেব করেই বলে বসলো কয়েকজন, যারা প্রতিবাদ ব্যাপারটাকে ব্যবহার করে নিজেদের আলোচনার বিষয় করে তুলতে চায়। এই ক্ষেত্রে মনস্তত্ত্ব সম্বন্ধে যাদের  সামান্যতম জ্ঞানও আছে তারাই বুঝতে পারবে যে সুনিপুণ কারসাজিতে বানিয়ে
 তোলা এই ছদ্ম - প্রতিবাদ আসলে প্রাথমিকভাবে না পাওয়ার  শ্বাসকষ্ট মনে হলেও সুনিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করবেই যে এই প্রতিবাদের আড়ালে রয়েছে অর্থনৈতিক  লেনদেনের সুনিপুণ  কারিগরি।এই অর্থই আসলে আমাদের চিরকালীন চাবুক যেটা লক্ষ্য থেকে ক্রমাগত সরিয়ে নেয় আমাদের। অর্থের সঙ্গে আসে আত্মপ্রতিষ্ঠার করুণ আকুতি। ধরা যাক,  কেউ ক্রমাগত  তথাকথিত মেন্সট্রিমকে অনুসরণ করে একসময় ক্লান্ত হয়ে প্রতিবাদী হয়ে পড়লেন আর তারপর তিনি করলেন কী? তিনি ডাক দিয়ে বসলেন সরকারি মেলা,সরকারি  পুরস্কার অস্বীকার করে  প্রতিবাদ করতে। তার প্রতিবাদে এসে পড়ে সুতপা সেনগুপ্তকে  মুখর হতে দেখে মনে হল এই লেখায় আসল কথাটা বলে ফেলা ভীষণ জরুরি। এই আসল কথাটা হল প্রতিবাদ ব্যাপারটার একটা ডিগনিটি আছে।যেখানেসেখানে, যত্রতত্র প্রতিবাদ করতে থাকলে শেষপর্যন্ত প্রতিবাদ ব্যাপারটাই লঘু হয়ে যায়। আচ্ছা ধরুন জয় গোস্বামীর এই কবিতার লাইনটা 'মরতে মরতে সে হেগে দেয়/আসলে এই তার প্রতিবাদ/আসলে এটা তার প্রতিবাদ'। ভাবুন তো প্রতিবাদের কোন সুদূরতম কোণে খোঁচা দিয়েছেন জয়? এখন এই যে প্রতিবাদ,  এ কবির হৃদয় থেকে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফুর্ততায় এসেছিলো।কিন্তু প্রতিবাদের উল্টোপিঠেই বসে থাকা যে কাঙ্ক্ষার হাঙর সে খপাৎ করে গিলে ফেলেছে  কবির লোভের স্তব্ধতাকে।এক্ষণে যে কবি প্রতিবাদী তাকেও তাই সন্দেহের চোখে দেখাই দস্তুর। কারণ যিনি লেখেন, প্রতিবাদ করো সময় দামাল বড়ো/প্রতিবাদ করো তিতুমীর,তিতুমীর" তিনিই আচম্বিতে হয়ে যান একটা সরকারের প্রতিনিধি।  এই গুলোনো মিথ্যের বাস্তবতায় ক্রমাগত অপ-বাস্তবতায় ব্যবহৃত হতে থাকা প্রতিবাদ আসলে বহুল ব্যবহৃত জীর্ণ  প্রতিবাদের হাস্যকর রিপিটিশনে মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য।মানে যেমন ধরুণ,ওই স্বর্ণযুগের গান বলে ক্রমাগত  হালখাতায় বাজাতে থাকা রিপিটিটিভ এই গানগুলোয়  শেষ অবধি গা-ঘিনঘিন করতে থাকা অনিবার্যতায়  এসে মনে হয় আর না বাজলেই ভালো।অথচ ভাবুন, এই গানগুলো সুরমূর্ছনায় যেকোনো সময়েই শ্রোতার চিত্ত মোহিত করতে বাধ্য।কিন্তু বহু ব্যবহারের জীর্ণতা মহৎ প্রতিবাদকেও আবছা করে দেয়।এটাই নিয়তি।তাই যত্রতত্র প্রতিবাদ না করে যদি প্রয়োজনমতো প্রতিবাদ হয় তবে আমাদের মতো নাদান লোকেরা স্বীয় পেভমেন্ট নির্দ্ধিধায় খুঁজে নিতে পারে এটুকুই এ-লেখার মূল ধ্বজা।  এটুকু বলার।ভেবে দেখো ও প্রতিবাদের জয়ঢাক,গিরিজা-মটর।বাজবে বাজতেই থাকবে।অকারণ। কারণ। অথবা নিতান্ত প্রাসঙ্গিক।

Comments