মেলা বই বইমেলায়
মেলা বই বইমেলায়
এসে গেলো বইমেলা। জায়গা পালটে গেছে এবার।এই নিয়ে আমার পাঠক-দশাতেই দু-দুবার ঠাঁইনাড়া হয়েছে মেলা।কে জানে কেমন জায়গায় এবার আসর বসাবে সে! মিলনমেলার ওই মাঠটাও ছিল আমার না-পসন্দ,তো এ জায়গা নিয়ে আর কী বলি? কিন্তু আমার ইচ্ছেতে কার কী যায় আসে।যায় আসুক তাও তো চাই না ছাই।তাই যেখানেই যাক না কেন আমার কী!আমি তো আমার দরকারে যাবোই যে কোনাতেই গিয়ে সেঁধুক সে,আমার যাওয়া চাই।আর গিয়ে খোঁজ করবো কোন বই-এর সেটাই এবার লিখবো। কেন? আমার মনে হয় আমার সম মনের মানুষরা যদি এর থেকে কিছু খবরাখবর আগে ভাগেই পায় তাই এই লেখা লিখতে বসেছি।আমার বাপু ভেতরে ভেতরে একটা নার্সিসিসম আছে।তাই আমি প্রথমেই যাবো সেই সমস্ত জায়গায় যেখানে আমার বইগুলো আছে।গিয়ে মনে মনে হাত বুলিয়ে দেবো নিজের বইগুলোকে।যখন প্রায় কেউ চিনতো না,তখনও আমার দু - দুটো বই করে দিয়েছে সপ্তর্ষি প্রকাশন।একটা অধরে গোখুর দন্ত,আর অসুখ ও আরোগ্য।ধন্যবাদ দিলেও কম বলা হয় সপ্তর্ষির স্বাতী আর সৌরভকে।এই তো ক'দিন আগেই একটা তরুণ কবিবন্ধু জুটেছিল আমার। আমি তাকে পাই নি।সে-ই আমার বই পড়ে আমাকে খুঁজে নিয়েছিল।একদিন যাদবপুরের ফুটপাথে বসে গভীর হতাশায় সে জানালো তার পাণ্ডুলিপি রিজেক্ট করেছে ধানসিঁড়ি। লেখে তো খারাপ না।বই তো হতেই পারে তার।একেবারে তরুণ। কে বই করবে যেচে?কিন্তু হতেই তো পারে ওরও একটা বই---কবিতার।আমি দ্বিতীয় কিছু ভাবি নি বলে দিলাম আমিই করবো বই।আর তারপর বই করা নিয়ে কত লড়াই। যে প্রকাশনা-টা আমাদের সেটা মূলত আমাদের কবিতা পত্রিকা 'পদ্যচর্চা'-র ওপর ভিত গেড়েছে।মজা হলো পদ্যচর্চা আমার একার না।আমাদের তিন বন্ধুর।তাই প্রকাশনা থেকে বই করতে তিন জনের অনুমোদন লাগে।আমি তরুণ কবির নাম প্রস্তাব করতেই প্রধান সম্পাদক শুভঙ্কর রাজি।ওর আমার ওপর অগাধ আস্থা।আর 'দাদাগিরি 'করতেই ও বেশি ব্যাস্ত।কবিতা নিয়ে আমাকেই ভাবতে দেয়।কিন্তু শুভ্র?সে তো আমার থেকে অনেক নামী।আর সত্যি বলতে কী আমার থেকে অনেক বেশি ঘাটের জল খেয়েছে ও। ও প্রথমেই বই করার প্রস্তাব নাকোচ করে দিয়েছিল।আমি অনেক বলে শেষে রাজি করালাম।তারপর থেকেই বিপত্তি। কবি ক্রমাগত জানতে চায় বই কবে হবে।প্রচ্ছদ করার জন্যে নিজের প্রেমিকার তোলা ফটো দিয়েছে সে।ফটো তো ভালো নয়ই তারপর তার রেজোলিউশনও কম।তা হোক কবি আমার বন্ধু। তার প্রেমিকার তোলা ছবি।যাকই না প্রচ্ছদে।হয়ে গেলো প্রচ্ছদ। তারপরে বুঝলান,এ কবি মহাকবি।সে বলতে শুরু করলো, সে আমায় কিছু বলে নি। আমি তার কাছ থেকে যেন কেড়ে নিয়ছি পাণ্ডুলিপি। তার পছন্দ হয় নি প্রচ্ছদ। এসব কথা সে আর তার বন্ধু বান্ধবরা লিখেও ফেললো ফেসবুকে।একেবারে ছ্যাছ্যাক্কার।কবিকে ওই বই করে দিয়ে আমি নাকি গভীর আঘাত দিয়েছি।মেজাজ হারালাম আমি।অনেকদিন ধরেই বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে সে আমার অর্থ-ধ্বংস করছিলো।আমি কিছুই বলি নি।কিন্তু এবার চালাকি করে অপদস্থ করার খেলা আর আমি নিতে পারলাম না।আমিও গরম খেয়ে গেলাম।শুরু হলো আকচাআকচি। শেষে নিজেই চেপে গেলাম।কারণ বুঝলাম এরা আমার ভেতরের ক্ষতর গভীরতা বুঝবে না।আর কোনো দল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার অভ্যেসও আমার নেই। আমার ভিতরে আদতে একটা প্রকৃত সারস বাস করে। মানুষ নিকটে গেলে সে উড়ে যাবেই। যাই হোক,এই ক্যাচড়া থেকে আরো বুঝলাম যে প্রকাশকদের কাছেও কোথাও একটা কবি-লেখকদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।তাই আমার বই যারা করে দিয়েছিল সেই স্বাতী -সৌরভ-কে যেমন ধন্যবাদ জানাতেই হবে,তেমনই বিপুল কৃতজ্ঞতা সোমাইয়াদির কাছে।সোমাইয়াদির রাবণ প্রকাশনা গত বছর করে দিয়েছে আমার রাত্রিচর বুনোচাঁদ। সেটা থাকবে লিটিল ম্যাগ প্যাভিলিয়নে রাবণের টেবিলে। সেখানে আমার বইটা যদি আপনি দেখতে নাও যান, তবু আসুন।কারণ অসাধারণ সব বই থাকবে সেখানে, থাকবে পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতার বই।সুব্রত সরকারের কবিতা - সমগ্র। নিশীথ ভড়ের কবিতা - সমগ্র।আর এবারে রাবণ যে দশটা বই করছে,তার মধ্যে আমি সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করছি যে বইটার জন্যে সেটা ভূত বিষয়ক অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়-এর লেখা।পড়বো ধীস্থিতি পত্রিকাটাও।ওখানে বাংলা কবিতায় অতিলৌকিক বিষয়ে থাকবে একটা মনোলোভা কথোপকথন। অনির্বাণদার লেখনির মতো কথাও আমার খুব প্রিয়।যে বিশাল পাঠাভ্যাসের জন্যে অনির্বাণদাকে শ্রদ্ধা করি,সেই একই কারণে বয়সে ছোট হলেও শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে হয় অর্ক দেব- কে।ওর প্রকাশনা নিষাদ। সেও কাজ করে একেবারে অফবিট।আপনি অবশ্যই এই বইমেলায় চলে আসুন নিষাদের স্টলে।পাবেন 'কথাবার্তা' বলে একটা বই।সেখানে রবীন্দ্রনাথ থেকে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,রামকিঙ্কর থেকে গণেশ হালুই হয়ে সুবিমল মিশ্র, বাদল সরকার ছুঁয়ে ঋত্বিক ঘটক, মায় বাংলা সাহিত্য,শিল্পজগতের বাঘা - বাঘা সব দিকপালদের সাক্ষাৎকার একসঙ্গে পাবেন।এ বই -এর মজাটা হলো এই বই-এ যারা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তারা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, যারা নিয়েছেন তারাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বইটা আমার চাইই। এই নিষাদই প্রকাশ করেছে তুষার রায়ের সমগ্র কাজ।তুষার বললেই মনে পড়ে 'পুলিশ,কবিকে দেখে টুপিটা তোর খুলিস'। কিংবা সেই ঘন মেদুর কবিতার পঙক্তি --- 'ছাই ঘেঁটে দেখে নিও পাপ ছিল কি না'। এইসবের বাইরেও তুষারের প্রচুর লেখা রয়েছে,আর সেগুলো খুব যত্ন করে সম্পাদনা করে দু- মলাটেএনে দিয়েছে অর্ক দেব। তুষার বলতেই মনে পড়লো আর এক প্রিয় কবি তুষার চৌধুরীর কথা।তাঁর বই তো পাবো দেবভাষায়।অতএব ওখানেও একবার ---। বইমেলায় এবার যেতে হবে মনফকিরায়।ওখান থেকে বেরোচ্ছে অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়-এর 'খাচ্ছি কিন্তু গিলছি না'। গদ্যের যে চাল ব্যবহার করেন আমার এই প্রিয় কবি-প্রাবন্ধিক সেটা আমায় মোহিত করে দেয়। অতঃপর ছোঁয়া প্রকাশনায় একবার ড্রপ খাব। বন্ধু তারেক আর সুনীতা কি বানালো বইমেলায় দেখে নিয়ে সেই যে আমি লিটিল ম্যাগাজিন-এর তাঁবুতে ঢুকে পড়বো আর কয়েকবার মাত্র মাথা তুলে এদিক-ওদিক ঢুঁ মারবো মশায়।এই যেমন দেব সাহিত্য কুটিরে বাচ্ছাদের সঙ্গে বাচ্ছা হয়ে ঢুকে একটু বাঁটুল আর হাঁদাভোঁদার নতুন কী হয়েছে জেনে নিতে হবে। আর মাঝেমধ্যে বিদেশের দোকানগুলোয় গিয়ে দু-একজন প্রিয় বিদেশী কবির বই খোঁজা।এই যেমন ধরুন ডেভিড হোয়াইট কিম্বা ডেভিড ম্যালুফ। বাংলাদেশকে বিদেশ আমি ভাবি না।তবে ওই তাঁবুতে যেতে হবেই এবার।জাফর ইকবালের ভূত সিরিজ আর হুমায়ুন আহমেদের শুভ্র সিরিজ আমার চাই।সেই সুযোগে বাংলাদেশের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাও হয়ে যেতে পারে।অবশ্য ওদেশে আমার যে বন্ধুরা আছে তাদের মধ্যে কেউ-কেউ আসছে আর এলে আমাদের কবিদের নিরাপদ তাঁবুতেই মৌতাত বসছে আমাদের। কথা তো সেরকমই আছে। লিটিল ম্যাগাজিনের সিংহভাগই কিনে ফেলি।যেমন ধরুন, রাবণ। ওই আত্মকথার পত্রিকাটা ব্যাপক প্রিয় আমার। বোধশব্দের নতুন সংখ্যা কেনার জন্যে প্রত্যেকবারের থেকেও বেশি মুখিয়ে বসে আছি এবার।এবার ওদের বিষয়, 'বাংলা কবিতার বিপণন'। আরো অনেক পত্রিকাই ঢুকে পড়বে আমার থলেতে।তার মধ্যে কয়েকটা তো ইতিমধ্যেই হস্তগত করেছি।যেমন ধরুন 'দশমিক'।পৃথ্বী বসু।একটা প্রায় দুধের দাঁত -ওলা ছেলে কী ভালো কাজটাই না করছে।ওদিকে আবার 'শুধু বিঘে দুই' খুব যত্ন করে প্রকাশ করেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একফর্মার বই।সম্পাদক সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী ভালোই না কাজ করছেন। ওখান থেকে কিনে ফেলেছি পার্থজিৎদের বইগুলো।খুব ভালো লেগেছে অনেক বই।অংশুমান করের বইটার কথা এই ব্লগেই আগে বলেছিলাম। সব মিলিয়ে একটা বিশাল হইচই।আমি আছি রাবণের টেবিলের আশেপাশে। চলে আসুন।আড্ডা হবে।চিয়ার্স।
Comments
Post a Comment