এই বাংলার শিক্ষা-কিসসা

 
          এই বাংলার শিক্ষা-কিসসা

আজ দোল-উৎসবের ঠিক আগের দিন।আমার স্কুলের,কলকাতা থেকে ৫৯ কি,মি দূরের গ্রামের ছোট্ট একটা স্কুলের ছাত্রী-ছাত্ররা আজ ব্যাগে ভ'রে আবীর নিয়ে এসেছিল,আর প্রধান শিক্ষক মহাশয় ক্রামাগত সেইসব রঙ বাজেয়াপ্ত করে বিদ্যালয়- এ শৃঙ্খলা বজায় রাখার গুরুদায়িত্ব পালন করছিলেন।এমন তুখোড় হাতে ছাত্রী-ছাত্রদের থেকে রঙ কেড়ে নেওয়ার প্রতাপ যখন মনের ভেতর দিব্যহাসির খোরাক যোগাচ্ছে, সেইসময়, ঠিক তারই মধ্যে ঢুকে পড়লো কেন্দ্র-সরকার- নির্দিষ্ট D.I.E.T -এর একটি দল।তারা এসেছে স্কুল- ভিসিট করতে।  তাদের দেওয়া ট্রেনিং শিক্ষিকা-শিক্ষকরা কিভাবে পালন করছে সেটাই তাদের জানার উদ্দেশ্য। সেই মহান কাজে নিয়োজিত দুই পারদর্শী আমাদের মতো শিক্ষক - শিক্ষিকাদের সঙ্গে সভা করে ফেললেন নাতিদীর্ঘ। সেও এক মজার সভা।নিজেদের কথা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বলে আমাদের কথা বলতে বললেন।কিন্তু শোনার সময় তাঁদের নেই।আরো আরো স্কুলে তাঁদের ভিসিট করতে হবে, তাই দ্রুত তাঁরা চলে গেলেন।কত কী-ই তো বলার ছিল,কিছুই বলা হল না। তাই কিছুটা অভিমানেই এই লেখাটা লিখতে বসা।

কেমন চলছে আমার শিক্ষাব্যবস্থা?আমার স্কুল?
প্রায় ৮বছর আমি যে স্কুলে আছি সেখানে পড়াতে গিয়ে আমার আর ভালো লাগছে না কেন? এই আমিই তো একটা সময় সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত  পড়াতাম,প্রায় নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে।ভীষণ ভালো লাগতো পড়াতে।একবার কবি মন্দাক্রান্তা আমায় বলেছিল 'তোর কবিতা কোথায়?' খুব গর্ব করে আমি বলেছিলাম,'আজকাল মনে হয় এই ছাত্ররাই আমার জীবন্ত কবিতা।' এই ঘটনা আমার চাকরি পাবার আগের।চাকরি পাবার পর গৃ্হ- শিক্ষকতা ছেড়ে দিলাম স্কুলের ছাত্রীছাত্রদের পড়ানোর আনন্দে।কিন্তু সেই আমি কেন ক্রমাগত ইচ্ছে হারালাম? ভাবতে বসি।আমি তো উপায় থাকা সত্ত্বেও বেছে নিয়েছিলাম এই গ্রামের স্কুল।গ্রামের ছাত্রী-ছাত্রদের পড়াবো ভেবে। তবে?

কবি সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর 'লিখনে,রন্ধনে,স্বপ্নে' বই-এর পিছনে কবি-পরিচিতিতে লিখেছেন,'পেশা - খুব অপছন্দের একটা কিছু।' প্রসঙ্গত বলে রাখি যে সংযুক্তাদি বালি অঞ্চলের একটা স্কুলের শিক্ষক। কেন আমারও মনে হচ্ছে এখন সংযুক্তাদি ঠিক ভেবেছেন? ওই স্কুল- ভিসিটরদের যেকথাটা বলা হলো না সেটা না বলতে পারলে মনটা খুব অস্বস্তিতে পড়ছে। তাই এই কথাগুলো আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নেব ভাবলাম।

কেন সরকারি স্কুলগুলোতে ক্রমাগত কমে যাচ্ছে ছাত্রসংখ্যা?কেন মা-বাবারা তাঁদের সন্তানদের সরকারি স্কুলগুলোতে পাঠাতে চাইছেন না আর? আসুন কারণগুলো একটু ভেবে নিই।

১) প্রধান এবং প্রথম কারণ মধ্যবিত্ত হাড় - হাভাতে বাঙালি মনে করে জীবনে সাফল্য মানে অর্থ উপার্জন করে মধ্যবিত্ততা থেকে উত্তরণ এবং সুখলাভ।ছেলে কত টাকার চাকরি বাগালো? সে চাকরি গু-এর দেশ ভারতে না হয়ে সোনার দেশ আমেরিকায় হল কি না? এইসমস্ত দিয়ে বিচার্য হয় শিক্ষার সাফল্য।অমর্ত্য সেন তাঁর 'ফার্স্ট বয়দের দেশ' প্রবন্ধে এইসব কথা খুব সুন্দর করে লিখেছেন।কিন্তু হায়! আমরা তো কেবল চাকরি - পরীক্ষার G.K -র উত্তর দেওয়ার জন্যে অমর্ত্য সেনের নামটা পড়েছি।তিনি কি ভাবছেন বা ভাবাচ্ছেন সেটা ভেবে আমাদের হবে কী? অতএব আমরা যারা সরকারি স্কুলের মাস্টারকুল,যারা সুমহান এবং জীবনের সম্ভবত সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা অর্থাৎ এস.এস.সি  দিয়ে মাস্টার হয়েছি তাদের এসব নিয়ে ভাবার দরকারটাই বা কী? তাই সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা- শিক্ষকরাও নিজেদের সন্তানকে বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চান।একবারও ভাবেন না যে, এই পদক্ষেপে তাঁরা সমাজকে কী বার্তা দিলেন? যাঁদের নিজের কাজের প্রতি নিজেদের আস্থা নেই তাঁরা কীভাবে দাবি করবেন যে ছাত্রী-ছাত্র তাঁদের কাছে শিক্ষা নিতে আগ্রহী হবে? এই শিক্ষিকা- শিক্ষকরা যখন পাবলিক ফোরামে গর্ব করে বলেন যে,তাঁদের সন্তান ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ছে তখন কেন সরকার তাঁদের শোকজ করে না? এই সমস্যার সঙ্গে জুড়ে আছে আবার স্টেটাস-সচেতনতা। অনেক মা-বাবা ভেবে বসে ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে সন্তানকে না পড়ালে তাঁদের স্টেটাস নেমে যাবে। সামাজিকতা বজায় থাকবে না। এই মধ্যবিত্ত ভাবনার সংকট থেকে তাদের উদ্ধার করবে কে?

২) কী পড়ানো হয় এইসব সরকারি স্কুলে?

নতুন সিলেবাস কমিটি অনেক ভেবেচিন্তে বেশ ভালো একটা সিলেবাস চালু করেছেন।সে আজ প্রায় বছর ছয়েক হয়ে গেলো।কীভাবে সেই সিলেবাস অনুসারে পড়াতে হবে তার জন্য প্রতি- বছর তাঁরা ব্যবস্থা করেন অভিমুখীকরণ কর্মসূচী। কারা শেখায় কারা শেখে সেখানে? যারা শিখতে যায় সেই শিক্ষিকা-শিক্ষকের একটা বড় অংশ ধরেই নিয়েছে তারা নিজেদের পাল্টাবে না। সেই আদ্দিকালে তারা যেভাবে পড়েছিল, সেভাবেই পড়ানো চালিয়ে যাবে। আর শিখবেই বা কী? কারা হয় ট্রেনার,মানে যাদের বড়- মুখ করে রিসোর্স পারসন বলে আনা হয়? তারা সবাই শাসক-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষক- সংগঠনের লোক।
এই লোকগুলোকে সংগঠন মাতব্বরি করতে পাঠায়।এরা নিজেরাই মন দিয়ে ট্রেনিং নেয় না।তাই এসেই বলে 'আমরাই ভালো করে বুঝতে পারি নি...' এরা ওই মাস্টার রিসোর্স পারসনদের ওপর দায় চাপিয়ে ট্রেনিং - এর দিনগুলোতে যা করে ও করায় তা অশ্বের ডিম্ব ছাড়া আর কিচ্ছু না।যতদিন রাজনৈতিক রঙ দেখে এই ট্রেনার নির্বাচন চলবে ততদিন যত ভালো চেষ্টাই করা হোক না কেন শিক্ষার হাল ফিরবে না।এদের মানে এইসব শাসক-দল-পদ-গন্ধ-ভজাদের বাদ দিয়ে যদি প্রকৃত পারদর্শীদের হাতে তুলে দেওয়া হতো ট্রেনিং- এর দায়িত্ব তবে হয়তো কিছু লাভ হলেও হতে পারতো।

৩) কেন পড়াতে পারে না শিক্ষকরা?

যারা নিজেরাই শিক্ষিত নয় তারা আবার শিক্ষা দেবে কী? শুনতে খারাপ লাগলেও শিক্ষকদের একটা বড় অংশ শিক্ষার অর্থ আর উদ্দেশ্যটাই এখনও ঠিকঠাক জানে না।জানবার চেষ্টাও করে না।তারা এ ফর আপেল,  বি ফর বলের গতানুগতিকতা থেকে বেরোবে না বলে মরণপণ করেছে। কারণ অনেক।প্রথমত --- তারা মনে করে তারা এক একজন বিরাট তালগাছ।সবজান্তা সরেস।তাদের কড়ে আঙুলের ডগায় শিক্ষাভাণ্ড ঘুরপাক খাচ্ছে।এই মানসিকতাটা গ্রামের মাস্টারদের আরো বদ্ধমূল।যে যত কম জানে তার তত ডাঁট।কুয়োর ব্যাঙ- দের বোঝালেও বুঝবে না।
দ্বিতীয়ত --- একদল মনে করে টাকা রোজগার করতে এসেছি।টাকা পেলেই হলো।এখানেও ওই মধ্যবিত্ত সমাজের সাফল্যভাবনার জাঁতাকল।  সে তো শিখেছে অর্থ রোজগার হল সাফল্যের মাপকাঠি।গোরু-ছাগলে ভরা গ্রামে মাস্টাররাই অর্থসাফল্য পেয়েছে বলে গণ্য হয়।অতএব তাদের আর পায় কে?

তৃতীয়ত --- গ্রাম্য-রাজনীতি।গ্রামের লোকের হাতে অঢেল সময়। তারা সারাক্ষণ মাস্টারদের পেছনে লেগে আছে।'মাস্টাররা কেন ট্রান্সলেশন করায় না?' -ধরণের ফালতু প্রশ্ন নিয়ে তারা ছুটে আসছে। তাদের কে বোঝাবে যে ওই পদ্ধতি বহুকাল উঠে গেছে।বোঝানোর চেষ্টা করে মাস্টার দেখলো তার নামে স্কুলের দেওয়ালে পোস্টার।কে রিস্ক নেয়! চালু করে দিল ট্রান্সলেশন।শুধু এটা না।এরকম হাজার ক্ষেত্রে  ক্রমাগত ঠোক্কর খেতে খেতে মাস্টার তার যে সামান্য ইচ্ছেটুকু ছিল সেটাও হারিয়ে ফেলে।

চতুর্থত ---মাস্টারদের নিজেদের অহং আর দলাদলি।কোথাও রাজনীতি, কোথাও স্বার্থ,কোথাও অহংবোধ মাস্টারদের মধ্যে সদ্ভাবের অন্তরায়।এই তো আমার স্কুলেই রায়দিঘির এক আকাট গেঁড়ে মাস্টার আছে।প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ইংরেজিতে অনার্স করে সে ভেবেছে বিশ্বজয় করে ফেললো।  ব্যাস।তাকে আর পায় কে।সে লোকের ভুল ধরতে থাকে।পাশের মাস্টারের ওপর উৎপাত করতে থাকে। তাকে দেখলে মনে পড়ে সেই আদ্যিকালের মাস্টারকুলের কথা।সে বি.এড পর্যন্ত করতে যায় না।অথচ দল করার  জন্যে তার কিছুই হয় না। কেন সরকার এইসব মাস্টারদের চিহ্নিত করে না?এই অহং যতদিন থাকবে ততদিন থাকবে নিজেদের মধ্যে ঠোকাঠুকি। দলগত কোন পদক্ষেপই নেওয়া যাবে না শিক্ষিকা-শিক্ষকদের মধ্যে থেকে।

কী দরকার পড়াতে গেলে?

শিক্ষা দিতে গেলে প্রথম যেটা দরকার সেটা হল জ্ঞান।জ্ঞান মানে শুধু তথ্যপ্লুত হয়ে থাকা না।দরকার প্রজ্ঞা।দরকার প্রতিনিয়ত নিজেকে সময়োপযোগী করে তোলার মানসিকতা।দরকার পসিটিভ ভাবনা আর ভাবাতে শেখা।সবচেয়ে দরকার স্বপ্ন দেখাতে শেখা।আমার যে ছাত্রীটি আজ দেশের প্রথমসারির বিজ্ঞানী সে আমার কাছে এসে বলে কেন আমার জন্যেই সে এই জায়গায় পৌঁছেছে,যে ডাক্তার সে কেন বলে আমিই তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছি,যে সবথেকে প্রিয় মেয়েটা বিজ্ঞান -পাঠের যোগ্যতা প্রমাণ করেও বাংলা-সাহিত্য ভালোবেসে আজ সাহিত্যক্ষেত্রে ক্রমাগত কাজ করে চলেছে সে কেন আমার সঙ্গে স্বপ্ন দেখে,কারণ আমি তাদের মাস্টার হতে চাইনি।স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলাম।ওই স্বপ্নটা আমরা অনেকেই দেখাতে পারি।মাস্টার থেকে শিক্ষক হয়ে উঠতে পারি অনেকেই।কিন্তু সিস্টেমের জাঁতায় পিষে যেতে যেতে আজ আমি যেমন হতাশায় তেমনই হয়তো অনেকেই নিঃশব্দে সরে যাচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য থেকে।

মাননীয় শিক্ষা-চিন্ত্যকরা আপনারা একটু যদি তলিয়ে দেখেন তবে হয়তো সরকারি শিক্ষার হাল ফেরে।কেউ কেউ অন্তত গর্ব করে বলতে পারে ' আমার সন্তান সরকারি স্কুলে পড়ে,আমি নিশ্চিন্ত, সে প্রকৃত শিক্ষিত হবে'।

                 -------     প্রসূন মজুমদার।
                               ২৮/২/১৮

Comments

Post a Comment