কলকাতার আদ্দামড়া-উদগাণ্ডু মারকুটেদের জন্য

 কলকাতার আদ্দামড়া- উদগাণ্ড মারকুটেদের জন্য

    গতকাল আমাদের কলকাতা শহরে একটা ঘটনা ঘটে গেল।মেট্রোরেলে ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একজোড়া যুবতী - যুবককে কয়েকজন আদ্দামড়া প্রৌঢ় নীতিপুলিশ যার - পর- নাই পিটিয়েছে।  সব ব্যাপারেই যেমন হয় তেমনই এই মধ্যযুগীয় নীতিপুলিশদের পক্ষেও একটা সমর্থন দেখতে পাচ্ছি।মানে কোনো কোনো মহিলা - কবি- যশপ্রার্থীর বক্তব্যে এবং সেই বক্তব্য-উত্তর মন্তব্যরাজিতেও একধরণের ক্ষীণ প্রশ্রয় এইসব নীতিপুলিশদের পক্ষে ধ্বনিত হতে দেখলাম।এতে যা বুঝছি,তা মনকে চঞ্চল করার পক্ষে যথেষ্ট। 

       কলকাতার কাছ থেকে যে আবদার ছিল, তা একটু খোলামনের পক্ষে হাঁটার আবদার।  কলকাতা যদি তালিবানি কায়দা রপ্ত করে তবে মনটা খারাপ হয় বই কি!!

   তাই আজ ঠিক করেছি এই কাকু/দাদুদের নিয়ে একটু খিল্লি করবো।

      যে কাকুরা ভাগাড়ের মাংস নিয়ে খলবলিতে ব্যস্ত তাদের মূল্যবোধ আকাশ-ছোঁয়া হতে বাধ্য। দুজন মানুষ পরস্পরকে জড়িয়ে রাস্তা হাঁটছে এ দৃশ্য সত্যিই তাদের কাছে অস্বাভাবিক। তাদের তো পরিচিত দৃশ্য হলো দুজন মানুষ পরস্পরকে গাল দিচ্ছে,খিস্তি করছে।ট্রেনের ভিড়ে নরম পাছায় লিঙ্গ ঠেকানো,আলতো করে হাত ঘসে দেওয়া, আর মেয়েদের অভিশাপ পাওয়া এটাই স্বাভাবিক দৃশ্য। এটা না হলে তাদের সমস্যা হয়। এক মহান নীতিজ্ঞ কবি-খ্যাতি-লোভী কদিন আগে হিং - ক্লিং মন্ত্রে মেয়েদের শরীরে লজ্জা নামিয়ে এনে ধর্ষণ আটকাতে চেয়েছিলেন এই শহরেই।কিন্তু দেখা যাচ্ছে মন্ত্র ভালো কাজ করে নি।মেয়ে তো লজ্জা পাচ্ছেই না,আবার ভিড়ের মধ্যে একটা ছেলেকে জড়িয়ে ধরেছে।এসবই পাশ্চাত্য - অনুকরণের ফল! তাই বাংলার সংস্কৃতি রক্ষা করতে দাদুরা পিটিয়েছে।দাদুরা বাংলার রক্ষাকর্তা। নিশ্চয়ই তারা কাল থেকে প্যান্টুলগুলো খুলে ফেলে খেটো ধুতি পরে মেট্রোয় উঠবে। প্রেম প্রকাশ্যে করলে এবার ঝ্যাঁটা - পেটা করা হবে। প্রেম অতি ভীষণ বস্তু।সে মানুষকে শেখায় আর একটা মানুষকে জীবন-বিপন্ন করেও বাঁচাতে।যেমন কাল প্রেমিকাটি তার প্রেমিককে জড়িয়ে নিয়ে মারের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিল।  এইভাবে অন্য মানুষকে বাঁচাতে চাওয়া খুবই বিপদ! কাকুরা যখন রোজ শেখাচ্ছে কীভাবে পাশের লোককে লেঙ্গি মেরে নিজে এগিয়ে যেতে হয়!তখন একটা মেয়ে প্রেমিককে বাঁচাতে জীবন বিপন্ন করছে এটা তো সওয়া যায় না! আমাদের প্রশাসন কী করে জানি না! তারা এই নিগ্রহকারীদের বিষয়ে নীরব। তারা নয় এদের চিনতে অসুবিধে বোধ করছে,কিন্তু যেসব নীতিবাগীশ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে কাকুদের ক্ল্যাপ দিচ্ছে,তাদের কিছুদিনের জন্যে সংশোধনাগারে নিয়ে একটু শোধন করা কি একেবারেই যায় না? আসল কথা হল প্রকাশ্যে জড়ানো যাবে কি না এ - ব্যাপারে তাদের মধ্যেও কিছু নৈতিক ডিলেমা রয়েছে।এক মহীয়সী লিখেছেন 'আমাদের সময়ে লুকিয়ে প্রেম করতে হতো'। সে তো বটেই তাই জন্যেই তো কেউ প্রকাশ্যে প্রেম করছে দেখলে আপনাদের চুলকোয়। প্রেম লুকিয়ে করতে হচ্ছে,এটাই যে হিপোক্রিসির প্রথম ধাপ সে আর আপনাদের মগজে ঢোকাবেন কেন? প্রেম কী নিষিদ্ধ বস্তু যে লুকিয়ে করতে হবে?আসলে আমাদের/আপনাদের জমানা পর্যন্ত ভীক্টোরিয়ান মরালিটির চর্চা হতো,তাই প্রেমকে একটা ভীষণ নিষিদ্ধ বস্তু বলে দেগে দেওয়া হতো।তার ফল হল দারুণ!  বাংলার গোটা তিন/চার প্রজন্ম হিপোক্রিসির চর্চায় মন রাখলো।  মুখে এক আর কম্মে আর এক এই জাতি যত রাজ্যের জোচ্চোর আর ঘুষখোর আর চিটিংবাজ লোকে ভরে ভাগড়ে পরিণত হল।এখন ভাগাড় যার জন্মভূমি তাকে স্বর্গে নিয়ে গেলেও সে স্বর্গকে ভাগাড় বানাতে চাইবে। এই নীতিজ্ঞ প্রজন্মটা বাংলাকে ঠিক কী কী দিয়েছে? এখন ব্যক্তিস্বাধীনতার এই দাবীর সময়ে এই স্বঘোষিত নীতিবাজদের মাথায় বাজ না পড়া অবধি নতুন প্রজন্মের শান্তি নেই। সেই মারকুটে লোকগুলোকে খুঁজে বার করতে ইচ্ছে করছে।বোঝাতে ইচ্ছে করছে যে আসলে তাদের যৌন - অবদমনের হতাশা তাদেরকে দুর্বৃত্ত করে তুললো। কলকাতা একটু পা চালিয়ে ভাই।দেরি হয়ে যাচ্ছে। এই নীতিবাদী গেরো থেকে না বেরোতে পারলে এগোনোর রাস্তা নেই।আর,সেই ছেলে-মেয়েদুটো মার খেয়ে কুঁকড়ে যেও না।তোমরা বেরিয়ে এসো। প্রেমের নতুন প্রতীক হয়ে ওঠো।নতুন কলকাতা তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে।

Comments